বছরজুড়ে আলোচনায় কোচিং প্রশ্নফাঁস শিক্ষক আন্দোলন

সর্বস্তরে প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং বাণিজ্যের ভয়াল বিস্তার ও শিক্ষক আন্দোলনে নাকাল ছিল বিদায়ী বছর। শিক্ষা খাত বারবার নানা কারণে আলোচনায়-সমালোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এছাড়া দুর্নীতি, অনিয়ম ও সেবা প্রার্থীদের ভোগান্তি তো ছিলই। বছরের শেষের দিকে আলোচনায় উঠে আসেন শিক্ষামন্ত্রী। ঘুষ-দুর্নীতি সম্পর্কে তার বিতর্কিত বক্তব্যে বিভিন্ন মহল তার পদত্যাগ দাবি করে। সব মিলিয়ে ২০১৭ সাল সাধারণ মানুষের কাছে হতাশা, অস্বস্তি ও অসন্তোষের বছর ছিল।

যুগান্তরের পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, প্রশ্নফাঁস, কোচিং বিস্তার ও শিক্ষক আন্দোলনসহ ১১টি বিষয় বিদায়ী বছরে বেশি আলোচিত ছিল। এগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে- এমপিও বাণিজ্য, শিক্ষা প্রশাসনে সিন্ডিকেট ও অযোগ্যদের ভিড়, পাঠ্যবই কেলেঙ্কারি ও জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) দুর্নীতি, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে ভোগান্তি ও দুর্নীতি, প্রাথমিকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ফল জালিয়াতি। এছাড়া সনদ জালিয়াতির দায়ে চিহ্নিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগাম লাগাতে না পারা, অবাস্তব প্রকল্প তৈরি ও বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতির ঘটনা রয়েছে। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে ধীরগতি, শিক্ষা আইন ও এমপিও নীতিমালা ঝুলে থাকার মতো ঘটনাও ছিল বিদায়ী বছরে। যদিও শিক্ষা খাতে ছোটখাটো ইতিবাচক কার্যক্রম ছিল। কিন্তু ব্যর্থতা আর গ্লানির মিছিলে সেসব নিষ্প্রভ হয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমাদের প্রত্যাশা শিক্ষা খাতে মানুষের স্বপ্নপূরণের জন্য নতুন বছর সহায়ক হোক। বিদায়ী বছরে শিক্ষা খাত থেকে তেমন বড় ও ভালো সুসংবাদ মানুষ পাননি। এটা আমরা দুদকের (দুর্নীতি দমন কমিশন) অনুসন্ধান এবং টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল) প্রতিবেদনেও দেখেছি। সরকারের নীতি-নির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার সঙ্গে দেশের অধিকাংশ মানুষের স্বার্থ জড়িত। এ খাতে তারা দুর্নীতি পছন্দ করেন না। শিক্ষায় ঘুষ-দুর্নীতি চললে পুরো দেশ পঙ্গু হয়ে যাবে। তাই জাতীয় স্বার্থে ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। শুধু কথায় নয়, প্রকৃত অর্থেই শূন্য সহনশীল অবস্থান নিয়ে জেহাদ ঘোষণা করতে হবে। নইলে সরকার ভবিষ্যতে বিপাকে পড়বে, যেহেতু এটা নির্বাচনী বছর।

২০০৯ সালের সরকার গঠনের পর থেকে টানা শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। শুরুর দিকে তার ইতিবাচক ভাবমূর্তি সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছিল। দায়িত্ব নেয়ার দেড় বছরের মধ্যে ২০১০ সালের জুনে ১৬ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করে ৪১ বছরের বন্ধ্যাত্ব ঘোচান তিনি। ফলে এমপিও ইস্যুতে শিক্ষামন্ত্রীর পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে আশা জাগিয়ে তোলে। আদালতের আদেশ ও বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর কারণে ৬ বছরে তিনি আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করতে পারেননি। বর্তমানে এমপিওবিহীন ৫ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানে ৮০ হাজারের বেশি শিক্ষক সরকারি বেতনভাতা বঞ্চিত হচ্ছেন। বছরের পর বছর এমপিও না পাওয়ায় হতাশ-ক্ষুব্ধ শিক্ষক-কর্মচারীরা ২৬ ডিসেম্বর থেকে রাজধানীতে আন্দোলনে আছেন। শুরুর দিকে শুধু অবস্থান করলেও রোববার থেকে তারা আমরণ অনশন শুরু করেছেন। শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘শীতের মধ্যে কষ্ট করেও যেহেতু কোনো লাভ হচ্ছে না, তাই দয়া করে আপনারা ফিরে যান।’ শুধু নন-এমপিও শিক্ষকরা নন, বিদায়ী বছরে বিসিএস শিক্ষক সমিতির ব্যানারে সরকারি কলেজের শিক্ষকরাও আন্দোলন করেছেন। সরকারি কলেজ শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন জাতীয়করণকৃত কলেজের শিক্ষকদের যাতে ক্যাডার সার্ভিসভুক্ত করা না হয়। বিপরীতে ক্যাডারভুক্ত হওয়ার দাবিতে জাতীয়করণকৃত কলেজের শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে একাধিক মামলাও হয়েছে। এছাড়া অবসরকল্যাণ খাতে বেসরকারি শিক্ষকদের কাছ থেকে বেতনের উপর বাড়তি ৪ শতাংশ হারে অর্থ কেটে নেয়ার প্রস্তাবেও আন্দোলন হয়েছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও আন্দোলন হয়েছে বিদায়ী বছরে।

গত কয়েক বছর ধরে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছিল। কিন্তু এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল সরকার। কিন্তু বিদায়ী বছরে সেই অভিযোগ আরও বড় আকার ধারণ করে। বছরজুড়েই বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি ও এপ্রিলে এইচএসসি পরীক্ষায় বিভিন্ন বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। সর্বশেষ জেএসসি, পিইসি এমনকি প্রাথমিক স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রশ্নও ফাঁসের অভিযোগ আছে। শিক্ষা খাতে দুর্নীতি-অনিয়মের ইস্যুতে দুদকের সঙ্গে এক বৈঠকের পর ব্রিফিংকালে শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে এক প্রকার অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। এ নিয়েও তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন। বিদায়ী বছরে কোচিং বাণিজ্য ভয়াবহ বিস্তার লাভ করে। অভিযোগ, বেশির ভাগ স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার অধিকাংশ শিক্ষক ঠিকমতো পড়ান না। বিপরীত দিকে সৃজনশীল পদ্ধতি শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের কাছে তুলনামূলক কঠিন বলে মনে হয়। এ কারণে শিক্ষার্থীদের কোচিংমুখী হতে হচ্ছে।

অভিযোগ, এমপিও কাজ হাতে পেয়ে মাঠপর্যায়ের একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী রীতিমতো বাণিজ্যে নেমেছেন। শিক্ষকদের অভিযোগ, আগে এ কাজে এক স্থানে ঘুষ দেয়া লাগলেও এখন চার স্থানে দিতে হচ্ছে। অভিযোগ, ২০০৯ সালে একজন সহকারী অধ্যাপকের নেতৃত্বে শিক্ষা প্রশাসনে সিন্ডিকেটের অপতৎরতা শুরু হয়। ওই শিক্ষক তখন ছিলেন শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। ব্যাপক অভিযোগ ও সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের নির্দেশে যদিও তাকে এপিএসের পদ থেকে সরানো হয়। কিন্তু তার প্রভাব এখনও শিক্ষা প্রশাসনে রয়ে গেছে।

বিদায়ী বছরের শুরুটা হয়েছিল পাঠ্যবই কেলেঙ্কারি দিয়ে। একদিকে নিন্মমানের পাঠ্যবই সরবরাহ করে জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। অপরদিকে ওইসব বইয়ে ছিল নানা রকম ভুলভ্রান্তি। একটি ইসলামী দলের সুপারিশ মতো বাংলা বইয়ে পাঠের পরিবর্তন আনা হয়। এসব নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনায় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। কিন্তু বছরের শেষের দিকে এসে টিআইবি সব গোমর ফাঁস করে দেয়। তাদের অনুসন্ধানে এনসিটিবির স্তরে স্তরে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অবৈধভাবে সম্মানী গ্রহণসহ নানা অভিযোগ উঠে আসে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে নানা ভোগান্তি ও দুর্নীতি এমনকি প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ আছে। ভুক্তভোগীরা জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাউশিতে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। ওই সিন্ডিকেট একদিকে সেবাপ্রার্থীদের নানা ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে, বৈধ কাজও অবৈধ বানিয়ে বছরের পর বছর হয়রানির মধ্যে ফেলে রাখা হচ্ছে। অভিযোগ, এমন অপকর্মে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা জড়িত। শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশের ২ বছর পরও বৈধ কাজ না করার দৃষ্টান্ত আছে। প্রাথমিকে ২০১৭ সালের শুরুটা হয়েছিল কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ফল জালিয়াতির মতো অপকর্মের মাধ্যমে। ২০১৬ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি পাওয়ার কথা থাকলেও রাজশাহী, সাতক্ষীরা, ঢাকার গুলশানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফল জালিয়াতি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও তেমন একটা নজির নেই। এছাড়া স্বাক্ষরতা প্রকল্পে এনজিও নির্বাচনে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে বিদায়ী বছরে।

বিদায়ী বছরে কিছুটা ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় দুর্নীতির মধুর হাঁড়ি খ্যাত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ)। পরিদর্শন ও অফিস ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া লাগায় সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বেড়েছে। ভাবমূর্তি উন্নয়নে বছরের শেষের দিকে এসে অনলাইন প্রতিবেদন দাখিল ও সমজাতীয় পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম শুরুর ব্যাপারে সরকার ২০১০ সাল থেকে বারবার আলটিমেটাম দিয়ে আসছে। কিন্তু সব বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। ওই অবস্থায় ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়কে ফের আলটিমেটাম দেয়া হয়। এটি গতকাল শেষ হয়েছে।

বিদায়ী বছরে সরকারি স্কুলে চলন্ত সিঁড়ি স্থাপন, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ ও ট্র্যাকিং কার্ড দেয়াসহ বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প প্রস্তাব করতে দেখা গেছে। যেখানে শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি নানা সমস্যা রয়েছে সেখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে উল্লিখিত প্রকল্পের মত অপ্রয়োজনীয়, বিলাসী ও অবাস্তব প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দফতরের পক্ষ থেকে সমালোচনাও করতে দেখা গেছে।

নানা ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ও গ্লানি থাকলেও বিদায়ী বছরে ইতিবাচক একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে বিভিন্ন বিষয় এবং অতিরিক্ত শাখা-শ্রেণীর শিক্ষকরা এমপিও থেকে নিষিদ্ধ ছিলেন। রোববার স্কুল-কলেজের ৭১৪৬জনকে এমপিও দেয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞা পরোক্ষভাবে তুলে নেয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here