ফ্রান্সই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন

সব রূপকথারই একটা শেষ থাকে। মস্কোতে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়া তো খেলতে নেমেছিল তার আগে রূপকথার গল্প লিখেই। সেই গল্প হয়তো হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসনের কিংবদন্তি রূপকথাকেও হার মানাতে পারতো লুঝনিকির স্টেডিয়ামে ৪৫ লাখ মানুষের দেশ ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপ শিরোপাটা জিতলে, ৫৯ মিনিটে ৪-১ গোলে পিছিয়ে থেকে তারপর সেটা করতে পারলে। কিন্তু ১৯৯১ সালে এই দেশটির জন্ম। আর ফ্রান্স ১৯৯৮ এর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। ফুটবল ইতিহাসের শুরু থেকেই ফুটবলের সাথে সমীহের সঙ্গে তারা। তাই এবারের দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের শেষটায় ক্রোয়াটদের কাঁদিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব ফুটবলের রাজা ফরাসিরা। ২০ বছর পর আবার তারা বিশ্ব সেরা। ক্রোয়াট রূপকথার ইতি ৪-২ গোলে ফাইনালে হেরে।

রোববারের ম্যাচের শুরু ক্রোয়াটদের আক্রমণে। কিন্তু ফুটবলদেব তাদের পক্ষে ছিলেন না বুঝি। নাকি টানা তিন ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে খেলে ফাইনালে ওঠার ক্লান্তি? নাকি এমন বিশ্ব আসরের ফাইনালে আগে কখনো না খেলার অনভিজ্ঞতা কে জানে? প্রথমে আত্মঘাতী গোলে ১৮ মিনিটে পিছিয়ে পড়ে ২৮ মিনিটে সমতা আনে। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে পেনাল্টি গোলে ৩৯ মিনিটে ২-১ গোলে পিছিয়ে পড়া। ওই লিড নিয়ে বিরতি থেকে ফিরে আবার আক্রমণ শুরু তাদের। কিন্তু অমিত প্রতিভাবান ফ্রান্স দল ডিফেন্স ও আক্রমণে সমান সেরা এই আসরে। সেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে ৫৯ থেকে ৬৫ মিনিটে ৪-১ গোলে এগিয়ে গেল ফ্রান্স। এরপর তাদের কি হারা মানায়? তাতে কি বিশ্বকাপেরও অপমান হয় না? এমনটা হলো না। ৬৯ মিনিটে আরেকটি গোল শোধ করতে পারলেও ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হলো ক্রোয়াটদের চোখের জলে এবং নতুন এক ফরাসি বিপ্লবে। ২০১৬ ইউরো বিশ্বকাপের ফাইনালে হারা ফ্রান্স ২০১৮ অঘটনঘটনপটিয়সী বিশ্বকাপ থেকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। সাধারণত দেখা যায় বিশ্বকাপ বা এমন বড় আসরের ফাইনালে হারা দল আক্ষরিক অর্থেই চোখের জলে ভাসে মাঠে। জল পড়ল বটে। শূন্য দৃষ্টির ক্রোয়াট দল দেখা গেল। কিন্তু এরপর দেখা গেল কোচ ও খেলোয়াড়রা কাঁধে হাত মিলিয়ে বৃত্ত গড়ে রানার্স আপ হওয়ার উল্লাসটাই সেরে নিল। এইটুকুন একটা দেশের ছোট্ট ফুটবল ইতিহাসে এটাও তো অনেক বড় অর্জন। ৩৯ শতাংশ বলের দখল নিয়ে ফাইনাল জিতে ফ্রান্স চ্যাম্পিয়ন বটে কিন্তু বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষের মনের চ্যাম্পিয়ন হয়ে রইল লুকা মদ্রিচদের এই ক্রোয়েশিয়ান দল।

ফাইনালটি প্রথম গোলের পর আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে রোমাঞ্চ ছড়ালো বটে, কিন্তু খেলা কতোটা উপভোগ্য হলো সেটাও এক বড় প্রশ্ন। প্রথমার্ধের মতো আধিপত্যের সাথেই দ্বিতীয়ার্ধের শুরু ক্রোয়াটদের এবং ১১ ফরাসির নিচে নেমে ঝড় সামলানো। কিন্তু ফরাসি নাটক বড় আনপ্রেডিক্টেবল। ৫৯ মিনিটে পল পগবা এবারের বিশ্বকাপে তার প্রথম গোলটা পেলেন নিপুণ ফিনিশিংয়ে। আর ৬৫ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপে ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ে এই আসরে তার চতুর্থ গোলটি করলেন। সাথে পেলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। ফ্রান্স ৪-১। এরপর ৬৯ মিনিটে মারিও মানজুকিচ একটি গোল করলেন। ৪-২। সেই ব্যবধান আর কমতে দিলেন না ফরাসিরা। প্রথমার্ধের ১৮ মিনিটে খেলার ধারার বিপরীতে যে ফরাসিরা এগিয়ে গিয়েছিল মানজুকিচের আত্মঘাতী গোলে, ১০ মিনিট পর ইভান পেরিসিচ সেটি শোধ করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। পেরিসিচের হ্যান্ডবলের কারণেই পেনাল্টি এবং ৩৯ মিনিটে আঁতোয়া গ্রিজমানের গোল। প্রথমার্ধে ২-১ এ এগিয়ে থাকা ফ্রান্স বিরতি থেকে ফিরেই তো খেলার ভাগ্য মাত্র ৬ মিনিটে নির্ধারিত করে দিয়ে শেষে চ্যাম্পিয়ন।

ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম ইতিহাসের মাত্র তৃতীয়জন হিসেবে খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে জিতলেন বিশ্বকাপ। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক ছিলেন। এবার কোচ। তার আগে এমন কীর্তিমান যে দুজন তারা হলেন ব্রাজিলের মারিও জাগালো ও জার্মানির কাইজার ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। আর এমবাপে প্রথমে নক আউট পর্বে পেলের পর দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে রেকর্ড গড়েছিলেন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলায় গোল করে। ফাইনালে ফ্রান্সের চতুর্থ গোলটি করে ৬০ বছর পর আবার পেলের পাশে। ১৯৫৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করেছিলেন পেলে (১৭ বছর ৬ মাস)। ফাইনালে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা এখনো রইলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি। কিন্তু ৬ দশক পর ফাইনালে গোল করা দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে তার পরের জায়গাটিতে নাম লেখালেন এমবাপে (১৯ বছর ৮ মাস)। পেলেও নিজের প্রথম বিশ্বকাপটি জিতেছিলেন টিনএজার হিসেবে, তার পাশে দাঁড়ানো এমবাপেও এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

৮০ হাজার দর্শকে টইটুম্বুর স্টেডিয়ামে শুরু থেকে টুকটুক করে আক্রমণে যায় ক্রোয়াটরা। প্রথমবার ফাইনালে তারা। নক আউট পর্বে ফ্রান্সের চেয়ে ৯০ মিনিট বেশি খেলার ক্লান্তি তাদের। কিন্তু তারাই আক্রমণ বানিয়ে যায়। ঠেকিয়ে যায় ফরাসি ডিফেন্স। প্রথম ১২ মিনিটে তো ফরাসিরা ক্রোয়াটদের ডি বক্সের কাছাকাছি একবারও আসতে পারলো না। এরপর একবার যাও এল এমবাপের কল্যাণে তাও গোছানো ছিল না। ডিফেন্স সহজেই ঠেকিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠে। কিন্তু ফুটবলদেবকে সাথে নিয়ে কি এই ম্যাচ খেলতে নেমেছে ফ্রান্স! নইলে ওভাবে কেন পিছিয়ে যাবে ক্রোয়াটরা যখন খেলছিল তারাই!

ক্রোয়েশিয়াকে প্রথমবার ফাইনালে তুলে আনতে মানজুকিচের ভূমিকা দুর্দান্ত। সেমি ফাইনালে সেরা খেলাটাই খেলেছেন। জয়সূচক গোলটাও করেছিলেন। কিন্তু এবার স্বপ্নের ফাইনালে কি না আত্মঘাতী গোলের নামের তালিকায় উঠলেন তিনি! বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম আত্মঘাতী গোলের মালিক তিনি! ওটাই ছিল ফ্রান্সের প্রথম বলার মতো আক্রমণ। এমবাপে ডান পাশ থেকে তৈরি করেছিলেন। তারপর ফ্রিকিকটা পাওয়া। ১৮ মিনিটে আঁতোয়া গ্রিজমান প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে বল তুললেন ক্রোয়েশিয়ার বক্সে। প্রতিপক্ষের জালে বল ঢুকাতে অভ্যস্ত মারিও মানজুকিচও অন্যদের সাথে লাফিয়ে উঠেছিলেন। তার মাথার ছোঁয়ায় বল নিজেদেরই জালে! গোলকিপারসহ পুরো ক্রোয়েশিয়া দল হতভম্ব। উল্লাসে মাতে ফ্রান্স, খেলার ধারার বিপরীতে ১-০ গোলের লিড নিয়ে। কিন্তু মাত্র ১০ মিনিটই ওই লিড ধরে রাখতে পারল ১৯৯৮ চ্যাম্পিয়নরা।

জান লড়িয়ে খেলতে অভ্যস্ত ক্রোয়াটরা ফরাসি ডি বক্সের মধ্যে দারুণ এক আক্রমণ রচনা করে। এবং শেষটায় ডান থেকে বক্সের ওপর বাঁয়ে ইভান পেরিসিচের পায়ে বল আসে। ডান পায়ে বলটাকে বাঁয়ে টেনে জায়গা বের করে অ্যাঙ্গুলার শট নিলেন বাঁ পায়ে। জোর ছিল। ডিফেন্স চিরে গোলকিপার হুগো লরিসকে হারিয়ে সেই বল জালে। ২৮ মিনিট। ক্রোয়েশিয়া ১-১ ফ্রান্স। কিন্তু ওই যে ফুটবলভাগ্য! সেমিতে একটি গোল করা ও আরেকটি করিয়ে দলকে রূপকথার ফাইনালে আনা এবং এই ম্যাচের প্রথম গোলটি শোধ করে সমতা আনা পেরিসিচ এবার শিকার! মাতুদিকে মার্ক করছিলেন। নিজেদের বক্সে হেড করতে লাফিয়ে উঠলেন। কিন্তু বল লাগল তার হাতে। রেফারি ভিএআরের সহায়তা নিলেন। পেনাল্টি। ৩৯ মিনিটে আঁতোয়া গ্রিজমান ঠাণ্ডা মাথায় এবারের বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে তার তৃতীয় গোলটি করলেন। সব মিলে এটি এবারের আসরে তার চতুর্থ। সেই গোলে ২-১ গোলের লিড ফ্রান্সের। জমে ওঠা খেলায় ক্রোয়াটরা নিজেদের কারণেই পিছিয়ে পড়ে গেল বিরতিতে। তবে তার আগে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে টানা দুই কর্নার আদায় করলো ক্রোয়েশিয়া। অধিনায়ক লুকা মদ্রিচের তোলা বলে ডিফেন্ডার ভিদা হেড করেছিলেন। এমন সময়ে গোল করাই উচিৎ এবং এমন সুযোগে। ভিদা পারলেন না।

এবং দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম গোলটি এমবাপের প্রথম শটে হয়নি। ফিরে এসেছিল ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে। ফিরতি বলে এমন শট নিলেন যে গোলরক্ষক সুবাসিচের কিছু করার থাকলো না। এরপরই বক্সের মধ্যে পাওয়া বলটাকে টিনএজার এমবাপে যেভাবে প্লেসিং করে গোল বানালেন তাতে তাকে রীতিমত অসম্ভব পরিণত এক ফুটবলার মনে হলো। ভবিষ্যৎ কিংবদন্তিরা বুঝি এমনই হয়। এরপর একটা কমেডি। লুগো হরিস। ফ্রান্সের গোলকিপার। ব্যাকপাসে বল পেলেন। এগিয়ে গেলেন মানজুকিচ। তাকে কাটাতে গিয়ে পারলেন না। মানজুকিচ বিশ্বকাপে তার তৃতীয় গোলটি করলেন। কিন্তু খেলায় ফিরতে এবং আগের তিনটি নক আউট ম্যাচের মতো অতিরিক্ত সময়ে খেলা নিতে যা করার দরকার ছিল তা করতে পারেনি ক্রোয়েশিয়া। প্রতিভা ও অভিজ্ঞতা এবং কৌশল সাথে ভাগ্যে বিশ্ব সেরার মুকুটটা তাই ফ্রান্সের। যদিও গোল্ডেন বল বা টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার কোনো ফরাসির নয়, অন্য কারোও নয়, একজন ক্রোয়াটের। ক্রোয়েশিয়ান রূপকথার গল্পের মহানায়ক ও নেতা লুকা মদ্রিচের।

SHARE

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here