পরিচালন ব্যয়ও জোগাড় করতে পারছে না বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স

তারল্য সংকটে ভুগছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সংকটে পড়ে পরিচালন ব্যয়ও জোগাড় করতে পারছে না। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে এই সংস্থাকে। অন্যদিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের অডিট শেষ না হলেও লোকসানের শঙ্কায় আছেন এয়ারলাইন্সটির কর্মকর্তারা। উচ্চমূল্যে লিজে আনা বিমান ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত এ সংকট কাটবে না বলে মন্তব্য তাদের।

জানা গেছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নতুন বিমান ক্রয়, ডলারে মূল্যের তারতম্য, উচ্চমূল্যে লিজে আনা বিমান, মার্কেটিং বিভাগের দুর্বলতা, কার্গোতে আয় কমে যাওয়ায় তারল্য সংকট ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে। এছাড়া বেশকিছু খাতে বিনিয়োগ করতে হয়েছে এই এয়ারলাইন্সকে। ২০০৮ সালে সংস্থাটি ২০০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যে ১০টি বিমান ক্রয়ের জন্য বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিনিয়ত প্রতিটি বিমানের বিপরীতে কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে এয়ারলাইন্সটিকে। ইতোমধ্যে বোয়িং চুক্তির ১০টি থেকে বহরে যুক্ত হয়েছে ছয়টি বিমান। এর বিপরীতে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাকি চারটি বিমানের মধ্যে দুটি যুক্ত হচ্ছে এ বছর। অন্য দুটি যুক্ত হবে ২০১৯ সালে। এ চারটি বিমানের কিস্তির টাকাও পরিশোধ করছে সংস্থাটি। একইসঙ্গে এসব বিমানের বীমার টাকাও পরিশোধ করতে হচ্ছে তাদেরকে।

সূত্র জানিয়েছে, বেশকিছু খাতে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এছাড়া বহরে যুক্ত হতে যাওয়া বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার বিমানের জন্য পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে বড় অঙ্কের টাকা। এছাড়া নতুন বিমানগুলোর ইন ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট, গ্রাউন্ড সার্ভারসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে এয়ারলাইন্সটির। আর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খাতে কেনা হয়েছে ১০০ কোটি টাকার ইক্যুইপমেন্ট। বর্তমানে বিমানবহরে ১৩টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিজস্ব চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর বিমান ও দুটি ৭৩৭-৮০০ বিমান। আর লিজে সংগ্রহ করা বিমান রয়েছে সাতটি। এর মধ্যে তিনটি এসিএমআই পদ্ধতিতে লিজে সংগ্রহ করা। বাকি চারটি বিমান দীর্ঘমেয়াদে ড্রাই লিজে সংগ্রহ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য আছে দুটি ড্যাস-৮ কিউ ৪০০ বিমান। এছাড়া ইজিপ্ট এয়ারলাইন্সের কাছে থেকে দুটি বোয়িং ৭৭৭ বিমান পাঁচ বছর মেয়াদে লিজ নিয়েছিল বিমান। এ দুটি বিমানের জন্যও লোকসান গুনতে হয় সংস্থাটিকে। যদিও গত মাসে এগুলো ফেরত দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের একজন কর্মকর্তা জানান, হজ মৌসুমে ফ্লাইট শিডিউল ঠিক রাখতে এসিএমআই পদ্ধতিতে চারটি বিমান সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বহরে যুক্ত হয়েছে তিনটি। এসিএমআই পদ্ধতিতে যে সংস্থা বিমান সরবরাহ করে তারা বিমানের পাশাপাশি ক্রু, মেইন্টেন্যান্স ও ইন্সুরেন্সের বিষয়টিও নিশ্চিত করে। এসব কারণে এসিএমআই পদ্ধতিতে আনা বিমানের বিপরীতে উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছয়বার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। যদিও এ কারণে ভাড়া বাড়ায়নি সংস্থাটি।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে মার্কেটিং বিভাগের দুর্বলতার কারণে প্রত্যাশিত আয় করতে পারেনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শুরুর দিকে টিকিট বিক্রির হার কমে যায় তাদের। গত বছরের নভেম্বর থেকে বিভিন্ন অফার ও মূল্য কমিয়ে আগাম টিকিট বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করে রাষ্টায়াত্ত এই সংস্থা। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে কার্গো শাখায় নন-শিডিউল ফ্রেইটারের কাছ থেকে ইনবাউন্ড আউটবাউন্ড কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ হিসেবে ৭৬ কোটি টাকা জমা হয়নি বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কোষাগারে। সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় এ তথ্য উঠে আসে। সেই সময়ে বিমানের কার্গোর মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন আলী আহসান। ২০১৭ সালের এপ্রিলে মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক পদে দায়িত্ব পান তিনি। এসব বিষয় নজরে আসায় বিমান পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক হিসেবে আলী আহসানকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার পরিবর্তে ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট মহাব্যবস্থাপক মো. আশরাফুল ইসলামকে গত মাসে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংস্থার বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও এয়ারলাইন্সটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.)মোহাম্মদ ইনামুল বারীর বক্তব্যে উঠে এসেছে আর্থিক সংকটের বিষয়টি।গত ৬ জুন বিমান শ্রমিক লীগ (সিবিএ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ইনামুল বারীর দাবি, দু্ই মাস ধরে বিমানের আয় কম। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বেতন দেওয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, তারল্য সংকট কাটাতে সংস্থাটির দুটি এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রিসিভড) ভাঙানো হয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তারল্য সংকট কাটানো হচ্ছে। বিমান ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের ৬০ কোটি ও পোলট্রি বিভাগের ৪০ কোটি টাকার এফডিআর ভাঙানো হয়েছে। সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ)শাকিল মেরাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘গত বছরগুলোতে ধারবাহিকভাবে মুনাফা করেছে বিমান। বিশ্বজুড়ে এয়ারলাইন্স খাতে কিছুটা মন্দা চলছে। আগস্ট ও নভেম্বরে বহরে নতুন বিমান যোগ হবে। তখন লিজের বিমান ফেরত যাবে। ডলার রেটের তারতম্যের কারণেও কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিও সংকটের অন্যতম কারণ। আর সংকট থাকলেও তা সাময়িক।’ একই প্রসঙ্গে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসাদ্দিক আহমেদ বলেন,‘একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আশা করছি, আমরা দ্রুত সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবো। লাভ-লোকসানের হিসাব অডিট না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।’

SHARE

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here