দুই বছরের প্রকল্পের ‘অর্ধেক হয়নি’ চার বছরে

হাতিরঝিল প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় জলাশয় রক্ষায় ২০১৩ সালে উত্তরা লেক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।

এর উদ্দেশ্য ছিল দখলের হাত থেকে লেক রক্ষা করা, দূষণমুক্ত করা, লেকের পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো, প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি, পরিবেশ উন্নয়ন এবং চিত্তবিনোদনের সুযোগ বাড়ানো।

২০১৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর একনেকে অনুমোদন পাওয়া ৩৭ কোটি ৩২ লাখ টাকার এই প্রকল্পের প্রাথমিক বাস্তবায়নকাল ২০১৬ সালের জুন ধরা হয়েছিল। এরপরে দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে গত জুনে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে এখন পর্যন্ত ‘বেশিরভাগ কাজই বাকি’ বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন উত্তরার বাসিন্দারা।

প্রকল্পের অগ্রগতি সংক্রান্ত রাজউকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৪৫ ভাগ।

এই প্রেক্ষাপটে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে বলে প্রকল্পের পরিচালক আমিনুর রহমান।

তিনি বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সময় বাড়ানোর অনুমোদন চেয়ে আমরা প্ল্যানিং কমিশনে একটি চিঠি পাঠিয়েছি। তবে মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্প ব্যয় বাড়বে না।”

উত্তরার ১ নম্বর সেক্টর থেকে ১৪ নম্বর সেক্টর পর্যন্ত বিস্তৃত ৬৩ দশমিক ৮৪ একর আয়তনের লেক সংস্কারের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্টারলাইট সার্ভিসেস লিমিটেড এবং কনভয় সার্ভিসেস লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান।

মঙ্গলবার উত্তরায় প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, উত্তরা ৩ ও ৫ নম্বর সেক্টরের মাঝখানে লেকের দুই পাশের পাড় বাঁধাই করা হয়েছে। লেকের পাড় বাঁধাই হয়েছে ৭ নম্বর সেক্টরের রবীন্দ্র সরণি পর্যন্ত অংশে। সড়কের নিষ্কাশন নালার পানি যেন লেকে গিয়ে না পড়ে সেজন্য লেকের পাড় ধরে মোটা পিভিসি পাইপও বসানো হয়েছে।

তবে পাড়ের ব্লক না বসানোয় বৃষ্টির পর ভেঙে গেছে বিভিন্ন জায়গা। কয়েকটি জায়গায় পানি যাওয়ার পাইপও ভাঙা দেখা গেছে।

লেক উন্নয়নের জন্য আশপাশের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছিল, সেসব দোকানপাটও আবার বসে গেছে।

এভাবে কাজ করায় সরকারি টাকার ‘অপচয় ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না’ বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর সড়কের বাসিন্দা রাফি মো. আতিকুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম, লেক উন্নয়ন হলে এলাকারও উন্নয়ন হবে। কিন্তু এখন তো দেখছি তা আরও পিছিয়ে গেল। লেক উন্নয়নের জন্য দুই পাশের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছিল। লেকের কাজ বন্ধ হওয়ায় সেগুলো আবার বসেছে।”বর্ষার আগে কাজ পুরোদমেই এগোচ্ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “বৃষ্টি আসার পর তা থেমে গেছে। কাজের যা অগ্রগতি হয়েছিল, বর্ষায় তাও নষ্ট হচ্ছে। দেখেন না বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে যাচ্ছে।”‘প্রকল্পের কাজ শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে গেছে’ মন্তব্য করে ক্ষোভ জানান ৩ নম্বর সড়কের বাসিন্দা আফজালুর রহমান।“এখন আবার এই প্রকল্পের সময় বাড়ানো হবে। এখন পর্যন্ত যে টাকা খরচ হয়েছে তার পুরোটাই জলে গেল!”

উন্নয়নকাজ বন্ধ করে দেওয়ার পর এর রক্ষণাবেক্ষণেও কেউ না থাকায় লেকে আবার দূষিত পানি যাচ্ছে বলে জানান ৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা সফিউল আজম।তিনি বলেন, “বৃষ্টির পানির সঙ্গে পয়ঃনিষ্কাশন নালার পানি এসে পড়ছে লেকে। এতে লেকের পানি দূষিত হচ্ছে। লেকের বিভিন্ন স্থানে মাছ মরে ভেসে উঠছে। মরা মাছের দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে আশপাশে।”কাজ বন্ধের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক আমিনুর রহমান বলেন, এবার আগেভাগে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় লেকের উন্নয়ন কাজ বন্ধ করা হয়।“শুকনো মৌসুম ছাড়া লেকের কাজ করা যায় না। এজন্য বন্ধ করে দিয়েছি। আবার অক্টোবরে কাজ শুরু করব।”পাড়ের বিভিন্ন জায়গায় ধসের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “সাধারণত পাড় বাঁধাই করে আমরা ব্লক বসিয়ে দেই। কিন্তু বৃষ্টির কারণে ব্লক বসাতে পারিনি। এজন্য কয়েক জায়গায় পাড় ধসে গেছে।”প্রকল্পে ধীরগতির কারণ জানতে চাইলে আমিনুর রহমান বলেন, ২০১৪ সালে ডিপিপি অনুমোদন হলেও সে সময় ‘মাস্টারপ্ল্যান’ করা হয়নি।

“শুরুর দিকে মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই প্রকল্প তৈরি করে তা অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজ শুরু করা হয়নি। ২০১৬ সালে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ শুরু করি। মাস্টারপ্ল্যান করার পর আমরা কাজ শুরু করি। এজন্য দেরি হয়েছে।“পরামর্শককে দিয়ে পুরো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা দেখতে হয়েছে। এরপর গত বছরের নভেম্বরে আমরা কার্যাদেশ দিয়েছি।”এই প্রকল্পে লেকের তলদেশের কাদা অপসারণ, তীর সংরক্ষণ এবং ব্লকের মাধ্যমে পাড় রক্ষা করার কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কনভয় সার্ভিসেস লিমিটেড।প্রতিষ্ঠানটির মালিক মাহমুদুন্নবী মুরাদ শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গত বছর নভেম্বরে কার্যাদেশ পেয়েছেন তারা।“১২ মাসের মধ্যে আমাদের এ কাজ শেষ করার কথা। সে হিসেবে এ বছরের নভেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। এর মধ্যে যদি শেষ করতে পারি ভালো, নইলে সময় বাড়াতে হবে।”

SHARE

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here