অধিনায়ক মাশরাফির চতুর্থ শিরোপা

পুরো মিরপুর স্টেডিয়াম যেন হয়ে উঠেছিল গেইলময়। শুধু যে রংপুরের সাপোর্টাররা তার ভক্ত তা নয়। ঢাকার সমর্থকরাও এদিন গেইল তাণ্ডব উপভোগ করেছিলেন মন ভরে। মোদ্দাকথা জয় হয়েছে ক্রিকেটেরই। গেইল তাণ্ডবের দিনে যে কোন দল উড়ে যায়। শুধু উড়ে যায় বললে কম বলা হয় খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। এর ব্যতিক্রম হলো না এবারও। গেইল তাণ্ডবে আগেই ব্যাকফুটে ছিল ঢাকা। সেখান থেকে আর উঠতে পারেনি তারা। ক্যাপ্টেন কুল মাশরাফির বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কোচিত পারফরমেন্সে পঞ্চম আসরের শিরোপা ঘরে তুললো রংপুর রাইডার্স।এর মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন দলের হয়ে পাঁচ আসরের চারটি শিরোপা তুলে ধরেছেন তিনি। যা অধিনায়ক মাশারাফিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

হাইভোল্টেজ ফাইনালে এদিন শুধু টস ভাগ্যই ছিল সাকিবের পক্ষে। তারপর আর কিছুই নিজের পক্ষে ছিল না। টস জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে আগেই বিতর্কের জন্ম দেন সাকিব। ব্যাটিংয়ে নেমে গেইলের খুনে ব্যাটিংয়ে ১ উইকেট হারিয়ে নির্ধারিত ২০ ওভারে ২০৬ রানে গিয়ে থাকে রংপুর। টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে রংপুরের শুরুটা ধীর ছিল। তাদের ২১ ছক্কার ইনিংসের প্রথম পাঁচ ওভারে ছিল না কোন ছক্কা! ষষ্ঠ ওভারের দ্বিতীয় বলে মোসাদ্দেককে ছক্কা হাঁকিয়ে ঝড়ের আভাস দেন গেইল। সেই আভাসটা তখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি ঢাকা! পরের বলেই গেইলকে জীবন দিয়ে বসে! কাভারে দ্রুতগতির সহজ ক্যাচই তুলে দিয়েছিলেন এই ক্যারিবিয়ান। ব্যক্তিগত ২২ রানে। নিচু ছিল। কিন্তু তাতে কি? এমন ক্যাচ হরহামেশাই ধরেন ফিল্ডাররা। কিন্তু সেই ক্যাচ ছাড়েন খোদ অধিনায়ক সাকিব! তখন কি সাকিবের মনে হচ্ছিল যে শিরোপাটাই হাত থেকে ফেলে দিলেন! জীবন পেয়ে মোসাদ্দেকের পরের বলেই ছক্কা হাঁকিয়ে বিপিএলে নতুন আরেকটি রেকর্ড গড়েন। আসলে এই আসরে ব্যাটিংয়ের অধিকাংশ রেকর্ডই তো এখানে মাত্র ২৬ ম্যাচ খেলা জ্যামাইকানের! এবার এই আসরে প্রথম বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে হাজারি রানের ক্লাব তৈরি করলেন সমুদ্রপাড়ের দৈত্য। এক বল পর সেই ওভারে ছক্কা হাঁকিয়ে পার্টিতে যোগ দেন ব্রেন্ডন ম্যাককালামও। তবে এরপরের ৪টি ওভার ভালোই নিয়ন্ত্রনে ছিল ঢাকার। এই ৪ ওভারে বাউন্ডারি মাত্র ২টি। ১০ ওভার শেষে তাই রংপুরের সংগ্রহ ৬৩ রান।এরপরই আগ্রাসনটা বাড়িয়ে দেন গেইল। সঙ্গে ম্যাককালামও। খালেদ আহমেদের ১১তম ওভারের শেষ তিন বলে ২টি ছক্কা ও ১টি চার মারেন গেইল। বাদ দেননি টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের সেরা বোলার শহিদ আফ্রিদিকেও। ১৪তম ওভারের শেষ দুই বলে টানা দুটি ছক্কা মারেন। টর্নেডোর শুরু দেখে শেরে বাংলার গ্যালারিতে সব সমর্থককে তখন শুধু রংপুরেরই মনে হয়! বিনোদনই তো পেতে এসেছেন তারা। আর গেইল তো বিনোদন দেওয়ার দুনিয়া সেরা ব্যাটিং কারিগর। ৩৩ বলে করেছিলেন ফিফটি। এবার আবু হায়দার রনির বলে আরও একটি ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে আকাশে বল উঠিয়ে দেন গেইল। বল ধরতে গিয়েছিলেন তিনজন ফিল্ডার। উইকেটরক্ষক জহুরুল ইসলাম অমিও ছিলেন। কিন্তু সবাইকে দুরে থাকতে বলে বল ধরার চেষ্টা করেন বোলার নিজেই। কিন্তু বলের ঠিক ছোঁয়া দুরত্বে থেকে গেইলকে আরো মারমুখী হয়ে সেঞ্চুরি করার পথে এগিয়ে দিতে সহায়তা করেন! পরের দুই বলে টানা দুটি ছক্কা। ফলে বিপিএলে গেইলের পঞ্চম সেঞ্চুরিটা ছিল তখন সময়ের ব্যাপার। সুনীল নারিনের করা ১৭তম ওভারের প্রথম বলে লং অনে ঠেলে দিয়ে তুলে নেন টি-টুয়েন্টি ক্যারিয়ারের ২০তম সেঞ্চুরি। বিপিএলে এটি তার পঞ্চম। আর ১০০ করতে যে ছক্কাটি মেরেছেন সেটি ইনিংসে তার ১১তম!তবে সেঞ্চুরি করেও থামেননি গেইল। নিজেকে আরো ছাড়িয়ে যাওয়ার নেশা তখন পেয়ে বসেছে তাকে। পরে খেলেছেন আরও ১২ বল। তাতে রান করেছেন ৪৬। শেষ ওভারে সাকিবকে মেরেছেন ৩টি ছক্কা। কিন্তু যে সাকিবের কারণে এই গেইল ঝড়ের শুরু সেই বোলারই শেষে তাকে শিকার করেন। বিপিএলে এটা এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার নতুন রেকর্ড এক ম্যাচ আগের সেঞ্চুরিতে করেছিলেন। ১৪টি। এবার ছাড়িয়ে গেলেন এখানেও নিজেকে। ১৮টি!সঙ্গে চারও আছে ৫টি। বিপিএলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস নিজেরই অপরাজিত ১২৬কেও ছাড়িয়ে গেলেন গেইল। গেইলের দিনে দারুণ এক হাফসেঞ্চুরি তুলে নেন ম্যাককালামও। ৪৩ বলে করেন অপরাজিত ৫১ রান। নিজের ইনিংসটি ৪টি চার ও ৩টি ছক্কায় সাজান এ কিউই ব্যাটসম্যান। বিশাল রানের পাহাড় টপকাতে গিয়ে শুরুতেই খেই হারায় ঢাকা। প্রথম ওভারে দলীয় সংগ্রহে কোন রান তোলার আগেই মেহেদী মারুফকে ফেরান অধিনায়ক মাশরাফি। ওই ওভারে কোন রান তুলতে পারেনি ঢাকা। পরের ওভারে সোহাগ গাজীর দ্বিতীয় বলে ফিরে যান ডিনলে। এরপর একে একে ফিরে যান লুইস (১৫), পোলার্ড (৫), সাকিব (২৬), মোসাদ্দেক (১), সাকিব (২৬)। এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন শুধু জহুরুল ইসলাম। দলের চরম মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ৪ চার ও ২ ছয়ে ৩৭ বলে তুলে নেন নিজের অর্ধশত রান। পরের বলেই উদানার বলে ফাইন লেগে বল ফ্লিক করতে গিয়ে বোল্ড হয়ে ফেরেন এ ব্যাটসম্যান। তখন দলীয় স্কোর ১৩২। শেষ পর্যন্ত রংপুরের হয়ে সোহাগ গাজী, উদানা, নাজমুল ইসলাম ২টি ও মাশরাফি, রুবেল, বোপারা ১টি করে উইকেট লাভ করেন। ফলাফল: রংপুর রাইডার্স ৫৭ রানে জয়ী।
প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: ক্রিস গেইল (রংপুর রাইডার্স)
প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ: ক্রিস গেইল (রংপুর রাইডার্স)

SHARE

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here